ভিআইপি’-দের জবানবন্দিতে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে

/, জাতীয় ইস্যু, বিডিআর ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯/ভিআইপি’-দের জবানবন্দিতে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে

ভিআইপি’-দের জবানবন্দিতে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে

আমার দেশ (রবিবার ২৬ ফেব্র“য়ারি ২০১২) রিপোর্ট করেছেন স্টাফ রিপোর্টার।

বিদ্রোহের ফৌজদারি অপেরাধের মামলা তদন্ত করছে সিআইডি। ওই তদন্তের সিআইডি তিন বাহিনীর প্রধান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীসহ ১৪ ভিআইপি আসামির জবানবন্দী নিয়েছে। জবানবন্দিতে তারা কেন সেনা অভিযান পরিচালনা করার সম্ভব হয়নি সে বিষয় তুলে ধরেছেন। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্র“য়ারি বিদ্রোহের সময় সেনা প্রধান ছিলেন মঈন উ আহমেদ। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম সেনা অভিযান চালাতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগবে। তৎকালীন বিমান বাহিনীর প্রধান বলেছেন, প্রচারপত্র বিলি করতে গিয়েই হেলিকপ্টার গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তৎকালীন নৌ বাহিনীর প্রধান বলেন, ভিতরের অবস্থা না বুঝার কারণে অভিযান চালানো সম্ভব ছিল না।

পিলখানা ট্রাজেডির ঘটনায় ১৬১ ধারায় সিআইডি এর কাছে জবানবন্দী দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা খাতুন, আইন প্রতিমন্ত্রি অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, স্থানীয় সকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ওয়ারেসাদ হোসেন, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নুর তাপস, মুস্তাক আহমেদ (নেত্রকোনা), মাহাবুব আরা (গাইবান্ধা), তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল শাহ মো. জিয়াউর রহমান, নৌ বাহিনীর প্রধান জেড ইউ আহমেদ, পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদ, র‌্যাব এর তৎকালীন মহাপরিচালক ও বর্তমান পুলিশের আইজিপি হাসান মোহাম্মদ খন্দকার ও ডিএমপি এর তৎকালীন কমিশনার নাঈম আহমেদ। তদন্তকারি কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় এইসব বাক্তির জবানবন্দী রেকর্ড করেন।

সাহারা খাতুনঃ
এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, ২৫ ফেব্র“য়ারি সকাল সাড়ে নয়টায় প্রথমে এক আত্মীয়র ফোনে তিনি বিদ্রোহের কথা জানতে পারেন। এরপর তিনি ঘটনা জানার জন্যে যমুনায় প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন বাসভবনে যান। সেখানে তিনি প্রধান মন্ত্রীকে খুবই উদ্বিগ্ন দেখেন। সকাল সাড়ে দশটার দিকে আওয়ামী লীগের নেতারা যমুনায় এলে আলচনায় বসেন। পিলখানার চারদিকে সেনা মোতায়নের জন্যে প্রধানমন্ত্রী তিন বাহিনীর প্রধানকে নির্দেশ দেন। সেনা প্রধান মঈন উ আহমেদ জানান সেনা মোতায়ন করতে ২ ঘণ্টা সময় লাগবে। এরপর প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টার পাঠাতে বলেন। এরপরে প্রধানমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজমকে পিলখানায় পাঠান তারা আলচনার পর ১৪ জোয়ানকে যমুনায় নিয়ে আসেন।

সাহারা খাতুন আরও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত অস্ত্র জমা না দেয়ার কারণে হোটেল আম্বালা ইনে বসে তিনি জোয়ানদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। এই আলচনায় তার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম ছিলেন। জোয়ানদের পে ডিএডি তৌহিদ, ডিইডি রহিম, সিপাহী কামালসহ কয়েকজন বিদ্রোহী আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী বুলেট প্র“ফ গাড়িতে করে রাত ১২টার পর আইন প্রতিমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিপিকে নিয়ে পিলখানায় যান। তখন চারদিক অন্ধকার ছিল, জওয়ানরা তাদের গাড়ি চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। তাদের অবস্থান এমন ছিল যে, গাড়ি চলতে পারছিল না। বিডিআর জওয়ানরা অল্প কয়েকটি বাতি জ্বালিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এক পর্যায়ে জওয়ানরা অস্ত্র জমা দিতে রাজি হন। এরপর তার উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় কোয়াটারগার্ডে কিছু সংখ্যক বিডিআর সদস্য অস্ত্র জমা দেয়। পরে তিনি কর্মকর্তাদের বাসস্থান থেকে লে. কর্নেল কামারুজ্জামানের পরিবার, লে. কর্নেল আকবরের পরিবার, মেজর নওরোজের পরিবার, মেজর ফিরোজের পরিবারসহ ১০টি পরিবার এবং অফিসার মেস এলাকা থেকে মিসেস ক্যাপ্টেন মাঝাহারকে উদ্ধার করেন। ভোর ৫টার দিকে তিনি পিলখানা থেকে বের হয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গিয়ে তাকে ঘটনা জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার জবানবন্দিতে বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের কিছুদিন আগে একদল জওয়ান তার বাসায় গিয়েছিল, কিন্তু তার সাথে দেখা হয়নি।

জাহাঙ্গীর কবির নানক:
মামলার অপর সাী স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, বেলা ১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী পিলখানায় গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে তাকে ও মির্জা আজমকে নির্দেশ দিলে তারা বিডিআর ৪ নাম্বার গেটে যান। পুলিশের কাছ থেকে একটি মাইক নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের পাঠিয়েছেন বলে জানান। এই ঘোষণা শুনে জওয়ানরা হুমকি দিতে থাকেন, তাদের দাবি না মানলে সব বিওপি, সচিবালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় গুড়িয়ে দেয়া হবে। জওয়ানরা তাদের বলেন, আপনাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা নাই, প্রধানমন্ত্রীকে পাঠান। আমরা সেনাবাহিনীর চেয়েও শক্তিশালী। আমরা সর্বদা বর্ডারে যুদ্ধ করি। একপর্যায়ে তারা আলোচনা করতে রাজি হয়। নানক জবানবন্দিতে আরও বলেন, ডিএডি তৌহিদ, হাবিব, নাসির, জলিলসহ মোট ১৪ জন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন যমুনায় যান। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে আলোচনা শুরু হয়। যমুনায় এইসময় প্রধানমন্ত্রীর সামনে ৩ বাহিনীর প্রধানরাও ছিল। ১৪ জওয়ান দাবি করেন, ৩ বাহিনীর লোকজন থাকলে তারা আলচনায় বসবেন না। এরপর প্রধানমন্ত্রী ৩ বাহিনীর প্রধানদের বাইরে যেতে বলেন। নানক বলেন, হাবিলদার রফিক উত্তেজিতভাবে বিডিআরদের দাবি তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের কাছে জানতে চান ভিতরের পরিস্থিতি কী? জবাবে জওয়ানরা জানান, ভিতরের সবাই ভালো আছে। সবাইকে একস্থানে জড় করে রাখা হয়েছে। নানক বলেন, সন্ধ্যা ৬টার দিকে সবাই পিলখানায় ফিরে যান। রাত ৮টার দিকে তারা জানান আলোচনার সিদ্ধান্ত সাধারণ জওয়ানরা মানবেন না। পরেরদিন বিকেল ৫টার দিকে তিনি পিলখানার ভিতরে গিয়ে দেখেন, যত্রতত্র অস্ত্র ও গোলাবারুদ পরে আছে, ৭-৮ টা গাড়ি পোড়া। বিডিআর মহাপরিচালকের বাসায় ছোপ ছোপ রক্ত আর একটি মৃতদেহ পড়ে আছে। ভিতরে লাশও পড়ে ছিল এইসব কথা তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানান বলে জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন।

কামরুল ইসলামঃ
আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম তার জবানবন্দীতে বলেন, রাতে বিদ্রোহী জওয়ানরা তাদের মাঠে বসিয়ে রাখেন। অনেক কিছু বলার পরও তাদের কোয়াটারগার্ডে নিয়ে জেতে রাজি হনি তারা। কয়েকটি বাসায় গিয়ে তারা ভিতরে ভীত সন্ত্রস্ত্র পরিস্থিতি দেখতে পান।

ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসঃ
সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস জবানবন্দীতে বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের ২ মাস আগে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বিডিআর সদস্য জাকিরের নেতৃত্বে কয়েকজন জওয়ান তার কাছে আসে। তারা বিডিআর এর বিভিন্ন সমস্যার কথা জানান। এইসব সমস্যা নেত্রীকে জানানো হবে বলে তিনি নেত্রীকে আশ্বাস দেন। ২৯ ডিসেম্বর ভোটকেন্দ্র পরিদরশনের জন্যে পিলখানা বুথে বিডিআর জওয়ানরা আবারো একই দাবি তুলে ধরেন। তাপস আর জানান, বিদ্রোহের দিন সকালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে থাকার সময়ে বিডিআর জওয়ান পরিচয় দিয়ে একজন মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে কথা বলেন।

শেখ সেলিমঃ
সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, বিদ্রোহের কয়েকদিন আগে ১৩ ফেব্র“য়ারি কয়েকজন জওয়ান তার কাছে আসেন। নিজেদের দাবির কথা জানালে তিনি বলেন, সেটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ব্যাপার। এর পরে জওয়ানরা চলে যান।

মির্জা আজমঃ
জবানবন্দীতে মির্জা আজম বলেন, জওয়ানরা দাবি করেন, সামরিক লোকজনদের সামনে তারা কোনো আলোচনা করবেন না, এর পর প্রধানমন্ত্রী তিন বাহিনীর প্রধানদের বাইরে জেতে বলেন।

মঈন উ আহমেদঃ
জবানবন্দীতে তৎকালীন সেনা প্রধান মঈন উ আহমেদ বলেছেন, ১৫ ফেব্র“য়ারি সকাল ৮:৫৫ মিনিটে বিডিআর মহাপরিচালক সাকিল আহমেদের সঙ্গে তার মর্টার নিয়ে কথা হয়। সকাল ৯:২৫ মিনিটে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস কর্নেল) জানান, বিডিআর দরবার হলে গণ্ডগোল হচ্ছে কিন্তু বিডিআর এর গোয়েন্দা কিংবা অন্য কোনো বিভাগ তাকে জানায়নি। সকাল ৯:৩৫ মিনিটে তিনি ৪৬ ইনফ্যান্ট ব্রিগেটকে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি সংক্রান্ত সংকেত দেন। ৯:৪৭ মিনিটে ডিজি বিডিআর এর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। ডিজি বিডিআর তাকে বলেন, দরবার হলে বিডিআর সদস্যরা গণ্ডগোল করছে। সব বিডিআর সদস্য হল থেকে বের হয়ে গেছে, আমারা চেষ্টা করছি কন্ট্রোল করার জন্যে। আমি দরবার হলে আছি। ডিজি বিডিআরকে বিচলিত না হওয়ার পরামর্শ দন। ১০টার কিছু পর আবারো ডিজি এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগে চেষ্টা করে তাকে পাইনি সেনা সদর।

৯:৫১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন সেনা প্রধান। প্রধানমন্ত্রীকে তিনি জানান, ৪৬ ব্রিগেডকে সতর্ক সংকেত দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞেস করেন, কতণ সময় লাগবে তাদের পৌছাতে। সেনা প্রধান বলেন, ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাহলে মুভ করান। ফোনে কথা শেষ করেই তিনি ৪৬ ব্রিগেড কে অভিজানে নির্দেশ দেন।

সকাল ১০টার দিকে তৎকালীন সেনা প্রধান সারাদেশে সেনা স্থাপনা গুলতে বিডিআর ব্যাটালিয়ন এলাকাগুলোতে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। সকাল ১০:২০ মিনিটে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাকিমের নেতৃত্বে ৬৮৫ জনের ৪৬ ব্রিগেড পিলখানার দিকে রওনা দেয়। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, তারা পিলখানার চারদিকে অবস্থান করবে কিন্তু পিলখানার ভিতরে বিডিআর সদস্যরা মর্টার, রিকোয়েলেস রাইফেলের ভালো অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয়ায় সেখানে সাঁজোয়া যান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু এপিসি এর গান (বন্দুক) কেন্দ্রীয় অস্ত্রগারে (সিওডি) এবং গোলাবারুদ রাজেন্দ্রপুরে থাকায় একটু দেরি হচ্ছিল।

বেলা ১১ টায় ৪৬ ব্রিগেড বহরে সম্মুখ ভাগে পিলখানার প্রধান ফটকে পৌঁছালে বিডিআর সদস্যরা ভিতর থেকে গুলি করে। এতে বাইরে অবস্থানরত ২ সেনা সদস্য গুলিবিদ্ধ হয় একজন মারা যান। সাড়ে ১১টার দিকে পিলখানার ভিতরের অবস্থা পর্যবেণের জন্যে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার মেজর ইমরানের নেতৃত্বে পাঠানো হয়। এর মধ্যেই বিগ্রেড কমান্ডার আনয়ারের নেতৃত্বে দুটি ব্যাটারি (উপদল) এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি ও ব্রিগেড পাঠানো হয়। সিলেটে অবস্থানরত পারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নে পারা কমান্ডোদেরও প্রস্তুত হতে বলা হয়। দুপুর ১২ টার দিকে এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি ব্রিগেডের দল দুটি নিউমার্কেট এলাকায় পৌছায়। তারা হেলিকপ্টারে চক্কর দেয়ার সময় নিচে থেকে গুলি ছুড়লে হেলিকপ্টারে লাগে এবং কিছু তি হয়। ১২ টার দিকে ফরমেশন কমান্ডারদের (ঊর্ধ্বতন অধিনায়ক) সঙ্গে কথা বলেন সেনা প্রধান।

সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পিএসও দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেনা প্রধানকে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন যমুনায় যাওয়ার নির্দেশের কথা জানান। সে অনুযায়ী ১:৫০ মিনিটে যমুনায় যান সেনা প্রধান এর পরেই বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধানরাও যমুনায় আসেন। প্রধানমন্ত্রী তিনবাহিনির প্রধানদের কাছ থেকে বিস্তারিত জানেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমঝোতার চেষ্টা চলছে। এই সময় দুই সেনা সদস্য গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর প্রধানমন্ত্রীকে জানান সেনাপ্রধান। সেনাপ্রধান কয়েকটি বিষয়ে বিদ্রোহীদের বলার জন্যে অনুরোধ করেন। জবানবন্দীতে সেনা প্রধান আরও বলেন, বেলা দুইটার দিকে নবাবগঞ্জ সুয়ারেজ লাইনে দুই কর্মকর্তার লাশ পাওয়া যায়। বেলা ৩:৪৮ মিনিটে ডিইডি তৌহিদের নেতৃত্বে ১২-১৪ জন যমুনায় আসেন। যাদের বেশিরভাগ ই ছিলেন অল্প বয়স্ক। তাদের আচরণ ছিল রু এবং তারা উত্তেজিতভাবে কথা বলছিল। শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে তাদের যে সম্মান দেখানোর কথা ছিল, তারা তা দেখাননি। প্রধানমন্ত্রী তাদের সাথে কথা বলে ১৫ মিনিট সময় দিয়ে বের হয়ে আসেন। জবানবন্দীতে মঈন উ আহমেদ বলেন, ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে দিয়ে তিনি ডিইডি তৌহিদকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, আমাকে চেনেন? তৌহিদ বলেন আপনি সেনা প্রধান। জানতে চায় বিডিআর এর ডিজি ও অন্য কর্মকর্তারা কোথায় এবং কী অবস্থায় আছেন? জবাবে তৌহিদ জানান, সকাল ৯টা থেকে আমাকে (তৌহিদ) অফিসে তালা দিয়ে রাখে। এখন বের করে নিয়ে আসে। আমি কিছু জানি না। কাউকে অন্যদের কাছ থেকে জেনে আসতে বলেন তিনি। এরপরে তৌহিদ বৈঠক কে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। জেনারেল মইন জবানবন্দিতে এই স¤পর্কে মন্তব্য করেছেন, পরে আমি জানতে পারি সে আমার সাথে মিথ্যা বলেছে। জেনারেল মইন আবারো বাক্তিগত কর্মকর্তাকে দিয়ে তৌহিদকে ডেকে আনেন। তখন তৌহিদ বলেন, বাকিরা সবাই জানে কিন্তু তারা কিছু বলছে না। সন্ধ্যা ৬:৩৭ মিনিটে বের হয়ে যান বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা।

রাত সাড়ে ১০টায় সেনা প্রধান জানতে পারেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বিদ্রোহী বিডিআরদের অস্ত্র সমর্পনের জন্যে পিলখানার ভিতরে যাবেন। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৩ কর্মকর্তার পরিবার ও ৫ ডিএডি এর পরিবারকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।

জবানবন্দির প্রায় শেষ অংশে মইন উ আহমেদ বলেন, আমার ধারনা আমার ট্রুপস পৌছার আগেই অর্থাৎ সকাল ১০:৪৫ মিনিটের মধ্যেই বিডিআররা বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন।

মইন উ আহমেদ জবানবন্দীতে বলেন, ২৫ ফেব্র“য়ারি দিবাগত রাতে, বিডিআর সদস্যরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সামনে অল্প কিছু সংখ্যক গোলাবারুদ জমাদিয়ে ২৬ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত বিদ্রোহ চালিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ এবং সাভার থেকে ট্যাঙ্ক আশার খবর পেয়ে ২৬ ফেব্র“য়ারি বিদ্রোহীরা অস্ত্রসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। রাতের আধারে বিডিআর সদস্যরা ৫ নাম্বার ফটক ফিয়ে ও পাশের অন্যান্য এলাকা দিয়ে পালিয়ে যায়। ২৭ ফেব্র“য়ারি পিলখানায় ঢুকে তিনি এক অবর্ণনীয় বীভৎস হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও বিভিন্ন প্রকারের নির্যাতনের চিহ্ন দেখতে পান।

জহির উদ্দিন আহমেদঃ
নৌবাহিনীর তৎকালীন প্রধান জহির উদ্দিন আহমেদ জবানবন্দীতে বলেন সকাল ১০টায় পরিচালক ইন্টেলিজেন্সির মাধ্যমে তিনি বিডিআর বিদ্রোহের খবর পান। বেলা ১টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে তাকে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন যমুনায় যেতে বলা হয়। তিনি তখন সেখানেই যান। ঘণ্টাখানেক পর প্রধানমন্ত্রী নিচে এসে তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।

নৌবাহিনীর প্রধান বলেন, তিনি (প্রধানমন্ত্রী) আমাদের মতামত জানতে চান। তিনি আমাদের বলেন, দুটি পথ খোলা আছে, সমঝোতা অথবা সামরিক অভিযান। কিন্তু ভেতরের অবস্থা বুঝা না যাওয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। পরে আমরা সমঝোতা করা ঠিক হবে বলে মত দেই। কিন্তু একইসঙ্গে সমঝোতা না হলে সামরিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে বিদ্রোহীদের কঠোর হাতে দমনের মত দেই। পরে প্রধানমন্ত্রী বের হয়ে যান। কিছুখন পরে ফিরে এসে তিনি বলেন, বিডিআর সদস্যরা সমঝোতার জন্যে আসবে। কিছুণ পর ১২-১৪ জন বিডিআর সদস্য আসেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চস্বরে এবং উত্তেজিত অবস্থায় কথা বলেছিলেন। এসময় বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা তাদের দাবি দাওয়ার মধ্যে সাধারণ মা ঘোষণার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে লিখিতভাবে দিতে এবং সংসদে পাস করে দিতে বলেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে তাদের কাছে বিডিআর কর্মকর্তাদের কথা জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন সবাই ভাল আছেন। তারপরে প্রধানমন্ত্রী তাদের আত্মসমর্পণ করার এবং কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারদের তুনি ছেড়ে দিতে বলেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের বলেন, এখনি পিলখানায় ফোন করে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দাও এরপর তিনি তিন বাহিনীর প্রধানদের দেখিয়ে বলেন, তোমরা আত্মসমর্পণ না করলে তারা কঠিন একশনে যাবেন। আলোচনার সময় বিদ্রোহীরা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করার বিসয় স¤পূর্ণ অস্বীকার করেন।

মোহাম্মদ জিয়াউর রহমানঃ
বিমানবাহিনীর প্রধান শাহ মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান জবানবন্দীতে বলেন, সকাল সাড়ে নয়টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারেক আহমেদ সিদ্দিক ফোন করে বলেন বিডিআর এর কিছু সমস্যা হয়েছে। তারেক জানতে চান হেলিকপ্টার প্রস্তুত রয়েছে কিনা। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুটি হেলিকপ্টার উড্ডয়ন করে। পাইলটরা গাছের ফাকে অসংখ্য বিডিআর সদস্য দেখা যাচ্ছে বলে খবর দেন।

বেলা সাড়ে ১১-১২টার দিকে সরকার থেকে নির্দেশনা আশে পিলখানার ভিতরে বিডিআর সদস্যদের অস্ত্রসমর্পনের উদ্দেশ্যে লিফলেট ছড়ানোর জন্যে। সোয়া ১২টার দিকে আরএকটি হেলিকপ্টার লিফলেট ছড়াতে যায়। এইসময় বিডিআর সদস্যরা গুলি করলে হেলিকপ্টারে জ্বালানি ট্যাঙ্ক তিগ্রস্থ হয়। প্রধানমন্ত্রী ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টাসহ মিটিং এ বসেন। প্রধানমন্ত্রী আমাদের যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে প্রস্তুত থাকতে বলেন। আমি তাকে আশ্বস্ত করি ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে বিমান বাহিনী কাজ করতে প্রস্তুত আছে। এ সময় মতিয়া চৌধুরী, শেখ সেলিম, জাহাঙ্গির কবির নানকসহ আরও কয়েকজন নেতা বিদ্রোহীদের অস্ত্রসমর্পণ করার জন্যে চাপ দিতে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন।

নূর মোহাম্মদঃ
পুলিশের তৎকালীন আইজি নূর মোহাম্মদ জবানবন্দীতে বলেন রাত ১টার দিকে পিলখানার ভিতরে তিনি প্রবেশ করেন। জওয়ানরা দরবার হলে ও ভিতরে আটকে থাকা পরিবারের অবস্থা দেখাতে রাজি হয়নি। জওয়ানরা সশস্ত্র থাকায় তাদের চাপ দেয়া যাচ্ছিল না। উল্লেখ্য সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদের জামাতা পিলখানা বিদ্রোহে নিহত হয়ছেন। তার মেয়ে পিলখানায় আটকা পড়েছিল।

হাসান মাহমুদ খন্দকারঃ
পুলিশের বর্তমান আইজি ও তৎকালীন জঅই এর মহাপরিচালক হাসান মাহমুদ খন্দকার জবানবন্দীতে বলেন, ২৬ ফেব্র“য়ারি পিলখানার ভেতরে বিদ্রোহী জওয়ানরা ডিএডি তৌহিদকে বিডিআর এর প্রধান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদসহ আরও কয়েকজন ভিআইপি জবানবন্দী দিয়েছেন।

About the Author:

Leave A Comment