দিল্লী দূর-আস্ত। দিল্লী অনেক দূর।

//দিল্লী দূর-আস্ত। দিল্লী অনেক দূর।

দিল্লী দূর-আস্ত। দিল্লী অনেক দূর।

বাংলায় একটি শব্দযুগল প্রচলিত আছে; যথা তুঘলকি কাণ্ড। এটা দিয়ে যা-ই কিছু বোঝানো হোক না কেন, তার সঙ্গে যে সাত-আটশত বছর আগের ভারত শাসনকারী তুঘলক বংশের বাদশাহ বা শাসনকর্তাগণের কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক আছে, এটা সর্বজনবিদিত। অনুরূপ আরেকটি শব্দযুগল বা বলতে গেলে প্রবাদ বাক্য জড়িত আছে তুঘলক বংশের ইতিহাসের সঙ্গে। সেই বাক্যটি এই পোস্ট-এর শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করেছি যথা ‘দিল্লী দূর-আস্ত’। তবে, এই বাক্যটি প্রখ্যাত সুফী সাধক দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানগণের নিকট অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া (রহ.)এর নামটিও জড়িত; তথা তাঁর আধ্যাত্মিক দৃষ্টির ঘটনা জড়িত।

আউলিয়া শব্দের অর্থ অনেকটা এরকম: আল্লাহর বন্ধু তথা সৎ কর্মশীল বান্দাগণ তথা প্রকৃত মুমিনগণ তথা সার্বিক অর্থেই দ্বীন ইসলামের শরীয়ত ও মারেফত পালনকারী ব্যক্তিগণ। পবিত্র কুরআনের দশম সূরা (ইউনুস) ৬২ নম্বর আয়াতে বলা আছে: নিশ্চয়ই আল্লাহর আউলিয়াগণের দুঃখিত বা শংকিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যা-ই হোক, আমার আলোচনা আউলিয়া শব্দের সংজ্ঞার উপরে নয়; আমার আলোচনা মানুষের আশা এবং সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ এর মাঝখানের অংশ নিয়ে। অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ম্যান প্রপোজেস এন্ড গড ডিসপোজেস’।

গিয়াসউদ্দিন তুঘলক একজন কঠোর প্রকৃতির শাসনকর্তা ছিলেন। মানুষ তার শাসন থেকে নিষ্কৃতি চাচ্ছিল। তৎকালীন রাজধানী দিল্লী শহরে একদিন প্রত্যুষে গুজব রটে গেল যে, বাদশাহ গিয়াসউদ্দিন তুঘলক মারা গিয়েছেন। রাজধানীর নাগরিকগণ, সত্য মনে করে খবরটিতে খুব আনন্দিত হলো, উচ্ছাস প্রকাশ করলো। এই খবর যখন বাদশাহ গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের নিকট পৌঁছালো, তখন তিনি রাগান্বিত হলেন। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, ‘মানুষ আমাকে গুজবের মধ্যে মেরেছে, আমি তাদেরকে আসলেই মারবো’। তিনি নগরীর কোতোয়ালকে হুকুম দিলেন গুজব রটনাকারীদেরকে হত্যা করা হোক। কোতোয়াল কার্য সম্পাদনে লিপ্ত হলেন। কে গুজব রটনা করেছিল আর কে করেনি এটা বের করা কঠিন কাজ ছিল। অতএব নির্বিচারে মানুষ হত্যা শুরু হলো। কয়েক হাজার মারা গেল, হত্যাযজ্ঞ চলতেই থাকলো।

সম্রাটের হুকুমে মারা যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য দিল্লীর নাগরিকগণ আশ্রয়ের সন্ধান করলেন। তৎকালীন দিল্লী থেকে মাইল তিরিশেক দূরে ছিল ফকির নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার আস্তানা। দিল্লী থেকে নাগরিকগণ পালিয়ে নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার আস্তানায় উপস্থিত হলেন। আস্তানায় জনসংখ্যা বাড়তে লাগলো; খাবার পানির ও ব্যবহারের পানির সংকট দেখা দিল। ভূগোলের জ্ঞান আছে এমন মানুষ মাত্রই জানেন যে, অতীতের বা বর্তমানের দিল্লী মহানগরী চতুর্দিকে মরুভূমি দ্বারা বেস্টিত। পানির সংকট মিটানোর জন্য নিজাম উদ্দিন আউলিয়া ভক্তগণকে বললেন, পুকুর খনন করো। যেই কথা সেই কাজ; বিনা পারিশ্রমিকে শত শত, ঘুরে ফিরে হাজার হাজার ভক্ত পুকুর খননের কাজে লাগলেন।

রাজধানী দিল্লীতে বাদশাহ গিয়াসউদ্দিন তুঘলোক এই সংবাদ পেয়ে রাগান্বিত হলেন। উজিরকে হুকুম দিলেন, ঘোষণা করে দাও আমার এখানে পুকুর খোড়া হবে এবং প্রতি শ্রমিক পারিশ্রমিক হিসেবে দিনে একটি করে স্বর্ণমুদ্রা পাবে। বাদশাহ অনুমান করলেন, স্বর্ণমুদ্রার আশায় দিল্লীবাসী দূরে যাবে না এবং যারা গিয়েছে তারা ফেরত আসবে। কিন্তু বাদশার ঘোষণায় কাজ হলো না। দিল্লীবাসী ফকির নিজাম উদ্দিনের আস্তানার দিকে যেতেই থাকলেন। এতে বাদশাহ আরও রাগান্বিত হলেন, হুংকার দিয়ে বললেন, “তবে রে!” সেনাপতিকে বললেন, ফকিরের আস্তানা গুড়িয়ে দেওয়া হোক, সৈন্যদল পাঠাও।

ফকিরের আস্তানা ধ্বংস করার জন্য অভিযান শুরু করার আগেই বাদশাহ গিয়াসউদ্দিনের নিকট সংবাদ আসলো, দূরবর্তী প্রদেশে বিদ্রোহ হয়েছে। বাদশাহ বিবেচনা করলেন বিদ্রোহ দমন করা অতিশয় জরুরী; ফকিরের আস্তানা পরে ধ্বংস করা যাবে। তিনি দূর প্রদেশে বিদ্রোহ দমনের জন্য সৈন্য বাহিনী প্রস্তুত করে রওনা দিলেন। হাতে-কলমে যুদ্ধবিদ্যা এবং সেনানায়কত্ব শিক্ষা দেওয়ার জন্য, বড় ছেলে আহমদ বিন তুঘলককে সঙ্গে নিলেন। রাজধানী দেখাশোনা করার জন্য রেখে গেলেন দ্বিতীয় পুত্র মুহাম্মদ বিন তুঘলককে। ইতিহাস বলে, মুহাম্মদ বিন তুঘলক ফকির নিজাম উদ্দিনের ভক্ত ছিলেন।

বাদশাহ বিদ্রোহ দমনার্থে দূরবর্তী প্রদেশে পৌঁছালেন, বিদ্রোহ দমন করলেন এবং পুনরায় দিল্লী অভিমুখে ফেরত রওনা দিলেন। প্রত্যহ যোজন পথ অতিক্রম করেন দিল্লী নিকটবর্তী হতে থাকে। ফকির নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার আস্তানায় ভক্তগণ নিবেদন করেন, হুজুর বাদশাহ এসে তো আপনাকে এবং আমাদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে। হুজুর নিজাম উদ্দিন আউলিয়া উত্তর দেন, দিল্লী দূর আস্ত; বাংলায় অর্থ হবে দিল্লী অনেক দূর। ভক্ত, যুবরাজ মুহাম্মদ বিন তুঘলক নিজেও ফকিরের নিকট এসে আর্জি পেশ করলেন: “আমার পিতা অত্যন্ত নিষ্ঠুর, তিনি দিল্লীর অনেক কাছে চলে এসেছেন, তিনি এসেই আস্তানা আক্রমণ করবেন, তিনি আপনাকে অপমান করবেন, তিনি আস্তান ধ্বংস করবেন, আপনি এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যান, ভক্তদেরকে নিয়ে যান, আমি সাহায্য করবো। রাজকোষ থেকে কিছু লাগলে আমি দেব, বাদশার নিষ্ঠুরতার কথা কল্পনা করে আমার আত্মা কাঁদছে; হুজুর আপনি চলে যান।” ফকির নিজাম উদ্দিন আউলিয়া বললেন, “বাবা, চিন্তা করো না; দিল্লী অনেক দূর, দিল্লী দূর আস্ত।”

সম্রাটের বহর রাজধানীতে ঢোকার মাত্র দুইদিনের পথ বাকি। যুবরাজ মুহাম্মদ ঠিক করলেন বিদ্রোহ দমনকারী পিতাকে সংবর্ধনা দিবেন, জাকযমকপূর্ণ রিসিপশন দিবেন, বিরাট প্যারেডের মাধ্যমে স্যালুট দিবেন। যেই কথা সেই কাজ। যুবরাজ মুহাম্মদ ভাবলেন, এই উসিলায় একটা দিন তো পাওয়া যাবে; ফকির নিজাম উদ্দিন আউলিয়া সিদ্ধান্ত নিতেও পারেন আস্তানা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। পুনরায় সংবাদ গেল; ফকির জানালেন দিল্লী এখনও অনেক দূর, দিল্লী হনুজ দূর আস্ত। যুবরাজ মুহাম্মদ কিছুই বুঝলেন না। কারণ, তিনি দেখছেন সবাই দেখছে দিল্লী ঢোকার জন্য মাত্র একদিনের পথ বাকি। কেউ বলতে পারছে না মুখ ফুটে, কিন্তু কেউ ফকির নিজাম উদ্দিনের কথার হিসাবও মিলাতে পারছে না।

সংবর্ধনা শুরু হলো; মঞ্চের সামনে দিয়ে অশ্বারোহী বাহিনী, উট আরোহী বাহিনী পার হয়ে গেল। সবশেষে পার হচ্ছে হাতি-বাহিনী। অনেকগুলো হাতি সুশৃংখলভাবে, মাহুতের নির্দেশে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং শুঁড় তুলে বাদশাহকে সালাম দিচ্ছে। হঠাৎ একটি হাতি উত্তেজিত হয়ে উঠলো; প্রথমে নিজের পিঠে চড়া মাহুতকে পিঠের উপর থেকে শুঁড় দিয়ে তুলে ধরে দূরে নিক্ষেপ করলো। তারপর উন্মত্ত হাতি ছুটে গেল মঞ্চের দিকে। মঞ্চের মোটা মোটা খাম্বা ধরে দিল টান। মঞ্চ ভেঙে পড়লো। হতাহত হলো। উন্মত্ত হাতি আশ্রয় নিল উন্মুক্ত মরুভূমিতে। উদ্ধারকারী কর্মীগণ মঞ্চের ভগ্নস্তুপ সরালেন; দেখলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক উপুড় হয়ে তার পুত্র আহমদ বিন তুঘলোককে আগলিয়ে রেখেছেন। সুলতান চেয়েছিলেন নিজে মারা গেলেও প্রিয় পুত্র আহমদ যেন বাঁচে। কেউই বাঁচেনি; গিয়াস উদ্দিন তুঘলোক এবং আহমদ বিন তুঘলোক নিহত হয়েছিলেন। যুবরাজ মুহাম্মদ বিন তুঘলোক অপ্র্ত্যাশিতভাবেই সিংহাসনে আরোহন করলেন।

সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলোক তথা বাদশাহ মুহাম্মদ বিন তুঘলোক পরবর্তী প্রথম প্রহরেই ফকির নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার আস্তানায় ছুটে গেলেন; মহান আল্লাহর প্রশংসা করলেন, ফকিরের শীর্ষত্ব নবায়ন করলেন। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের জন্য দিল্লী নিজের হয়ে গেল; গিয়াসউদ্দিন তুঘলোক ও তার সন্তান আহমদ বিন তুঘলোক এর জন্য দিল্লী অনেক দূর থেকে গেল। অপবিত্রদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়, পবিত্ররা; লক্ষ্যবস্তু থেকে দূরেই থাকে। দয়াবানগণ আক্রমণের শিকার হন নিষ্ঠুরদের থেকে; নিষ্ঠুরতারও একটা শেষ থাকে।
……………………………………………….
ছোটকালে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় ক্লাস এইটে অথবা ক্লাস নাইনে, র্যা পিড-রিডার Rapid-Reader হিসেবে যাযাবর-এর বিখ্যাত বই ‘দৃষ্টিপাত’-এর একটা অংশ আমাদের পড়তে হয়েছিল; ওই অংশটাই ছিল, নিরীহ প্রজাদের উপর হত্যাকাণ্ড চালানোর পরিণতিতে এবং আধ্যাত্মক মহাপুরুষ হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার সঙ্গে বেয়াদবী করার পরিণতিতে, গিয়াস উদ্দিনের ভাগ্যে যা ঘটেছিল তার বর্ণনা। পরবর্তীতে নিজের উদ্যোগে দৃষ্টিপাত উপন্যাসটি পুরোটাই পড়ি; সুখপাঠ্য ইতিহাস-নির্ভর। ২৮ জানুয়ারি ২০১৮ রবিবার বিকেলবেলা নিজের দপ্তরে বসে পত্রিকা পড়ছিলাম এবং পৃথিবীব্যাপী, দেশে দেশে ভালো শাসক ও মন্দ শাসকগণের কথা মনে আসছিল। তখন হঠাৎ করেই, ইতিহাসের এই কাহিনী মনে আসলো।

By | 2018-02-07T07:04:44+00:00 January 28th, 2018|News|0 Comments

Leave A Comment

X