সংসদ ভেঙে দিলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরাজয় হবে না নূরে আলম সিদ্দিকী

//সংসদ ভেঙে দিলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরাজয় হবে না নূরে আলম সিদ্দিকী

সংসদ ভেঙে দিলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরাজয় হবে না নূরে আলম সিদ্দিকী

২০১৮ সালের বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশে নানা দিক থেকে। এবারের হাড়ভাঙা ঠাণ্ডা অন্য বছরের চেয়ে ২০১৮-এর আগমন-বার্তা জোরেশোরেই জানিয়ে গেছে। এই হাড়কাঁপানো শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত। ব্যাপকভাবে প্রাণহানি না হলেও তীব্র শৈত্যপ্রবাহে উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে রংপুর ও গাইবান্ধায় মানুষের প্রাণহানির কথা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রান্তিক জনতার একটি বিশাল অংশ গ্রামে বসবাস করে। অনেক গ্রামে বৈদ্যুতিক সংযোগ নেই। বাড়িঘরগুলোরও নিদারুণ করুণ অবস্থা। আমাদের দেশে রাজনীতি ও সংবাদ মাধ্যম প্রান্তিক জনতার জন্য নয়। সবকিছুরই কেন্দ্রবিন্দু একটাই—ক্ষমতা দখল অথবা ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি থেকেই অর্থনৈতিক বাজারে একটা অশনি সংকেত দেখা দিয়েছিল। তার বিরুদ্ধে কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা তো গ্রহণ করা হয়ইনি, বরং সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে বড়, ছোট ও পাতিনেতা এবং মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী সবাই মহাআনন্দে বিগলিত চিত্তে উন্নয়নের ঢাক বাজাচ্ছেন। সরকারপ্রধানও আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে উন্নয়নের ব্যান্ড বাজাতে শুরু করেছেন। পদ্মা সেতুর পিলারগুলো দৃশ্যমান এবং নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে। এই পুলকে আত্মহারা সরকারপ্রধান ও চেলাচামুণ্ডারা এতটাই বিমোহিত যে, তাদের প্রচার-প্রচারণার ধরন দেখে মনে হয়, পদ্মা সেতুর মাধ্যমে যেন তারা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনীতির সব সমস্যার পুলসিরাত পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন।

বাংলাদেশের প্রান্তিক জনতা গণতান্ত্রিক মানসিকতার তো বটেই, খুবই নির্বাচনমুখী। নির্বাচনের কোনো গন্ধ পেলেই তারা উৎসবের আমেজে মেতে ওঠেন। এই মাতোয়ারা জনগণের আপ্লুত হৃদয়ের উচ্ছলতাকে খাটো করে দেখার বা নিরুৎসাহিত করার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই। তবুও প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোটের বক্তৃতা-বিবৃতি গভীর নিরিখে পর্যালোচনা করলে আদৌ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কিনা সেই সংশয় ও সন্দেহটা অনুভূতিকে গ্রাস করে। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি একটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংগঠন। সামরিক জেনারেলের ঔরসে এবং সেনাছাউনির গর্ভেই বিএনপির জন্ম। ফলে সেখানে কোনো রাজপথের লড়াকু নেতৃত্ব ও কর্মী সৃষ্টি হয়নি। নেতা-কর্মীর মধ্যে রাজপথ উত্তপ্ত করা তো দূরে থাক, নগদনারায়ণের প্রতি তাদের উদগ্র কামনাই স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক সাম্প্রতিককালের একটি উদাহরণ আমি আনতে চাই। ইদানীংকালে বকশীবাজারের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বেগম খালেদা জিয়ার মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। আদালতে হাজিরার নির্ধারিত দিনে খালেদা জিয়া হাজিরা দিয়ে ফেরার সময় রূপসী বাংলা হোটেলের মোড়ে ২০০/৩০০ যুবক অল্প কিছুক্ষণের জন্য সমবেত হয়। আমি ওয়ালসো টাওয়ারের ১৮তলা থেকে প্রতিনিয়তই এই আজব দৃশ্যটি প্রবল কৌতুকের সঙ্গে লক্ষ্য করি। বেগম জিয়ার গাড়িটি রূপসী বাংলা পার হয়ে যেতে না যেতেই সেখানে জমায়েত হওয়া প্রায় একই বয়সের যুবকরা চোখের নিমিষে উধাও হয়ে যায়। আমি যতদূর লক্ষ্য করেছি, স্লোগান-বিবর্জিত ওই জমায়েতটির স্থায়িত্ব থাকে মাত্র কয়েক মিনিট। এতে বেগম খালেদা জিয়ার মানসিক প্রতিক্রিয়া কী হয়, সেটি ধারণা করার চেষ্টায় ব্যাপৃত না হয়েও এটা শতভাগ নিশ্চয়তার সঙ্গে বলা যায়—সমবেত যুবকরা একান্তভাবেই অরাজনৈতিক এবং ভাড়া করা। এদের সমবেত করার ঠিকাদারি যিনিই গ্রহণ করে থাকেন না কেন, রূপসী বাংলার পশ্চিমদিকে সমবেত যুবকদের অবস্থানের মেয়াদ সম্ভবত ৩০/৩৫ মিনিটের জন্যই চুক্তিবদ্ধ থাকে। আমার সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে এমন বিস্ময়কর অরাজনৈতিক ও দুর্বল যুব সমাবেশ কখনো দেখিনি।

সেই ’৬০-এর দশকের প্রথমদিক থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় সম্পৃক্ততার কারণে মিছিলে পদচারণা আমার স্মৃতিতে আজো ভাস্বর। রাজপথে অবস্থান নেব, সেখানে বজ্র নির্ঘোষে স্লোগান উচ্চারিত হবে না, উপস্থিত তারুণ্যের কণ্ঠে বজ্র নির্ঘোষে উচ্চারিত স্লোগানে এলাকাটি প্রকম্পিত হবে না—এটা আমার কল্পনার অতীত। কিন্তু নিত্যনৈমিত্তিক সেই দৃশ্যটি বেদনাহত চিত্তে আমাকে নিয়মিত অবলোকন করতে হচ্ছে। আরও বিস্ময়কর হলো, রূপসী বাংলার মোড়ে সমবেতদের চারপাশে তেমন কোনো পুলিশ বেষ্টনীও লক্ষ্য করা যায় না। কে জানে, ভিতরে ভিতরে কোনো সমঝোতা আছে কি না। তবে এটা সর্বজনবিদিত, দলের একমাত্র ক্ষমতার আধার তার রাজনৈতিক দৈন্য ও দুর্দশা দেখে প্রায় সুনিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই অরাজনৈতিক কর্মীবাহিনী দিয়ে কোনো রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের আন্দোলন সফল হওয়া তো দূরে থাক, শুরুই করা যাবে না। এই বিরোধী শক্তির অসারতা শুধু সরকারের স্বৈরাচারী মানসিকতা সৃষ্টিতেই প্রণোদনা দিচ্ছে, তাই না; আগামী নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রশ্নেও প্রতিনিয়তই সংশয় সৃষ্টি করে চলেছে। রাজনীতির নির্মম সত্য হলো, অধিকার আদায় করে নিতে হয়, প্রতিপক্ষের করুণা ও অনুকম্পায় এটা আসে না।
আমরা স্পষ্ট লক্ষ্য করেছি, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জন করে নির্বাচনকে প্রতিরোধ করার কোনো ফলপ্রসূ আন্দোলন বিএনপি জোট করতে পারেনি। বিএনপির ১৫ ফেব্রুয়ারির সংসদের আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ১২ দিন। ওই সীমিত আয়ুষ্কালের মধ্যেই তারা কেয়ারটেকার সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এই কেয়ারটেকার সরকারের শাসনতান্ত্রিক সংশোধনীর (তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা প্রচলনের সংশোধনী) কারণেই ১৫ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সংসদটিকে বসতে দেওয়া হয়। নইলে সেই ফুরসতও হয়তো তারা পেতেন না।
যদিও দেশের মানুষ নির্বাচন পেতে উদগ্রীব। স্বপ্নবিলাসী হৃদয়ে এই অনিশ্চিত নির্বাচনটির ঘ্রাণ নিতেও অনেকে শুরু করেছেন। তবুও নির্বাচনটি আদৌ সবার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে কিনা, সে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির বয়স ৪৭। এই ৪৭ বছরেও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এলো না। নির্বাচন পদ্ধতি, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতায়ন, একটি দলের সঙ্গে অন্য দলের ন্যূনতম রাজনৈতিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগ একেবারে নেই বললেই চলে। আমি পাশ্চাত্যের কোনো উদাহরণ টানব না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও রাজনৈতিক অবস্থা দৃষ্টান্ত দেওয়ার মতো যথেষ্ট স্থিতিশীল। সেখানে জনগণের শিক্ষা-দীক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থার স্তরে আমাদের সঙ্গে বিশাল তারতম্য নেই। বরং ক্ষেত্রবিশেষে বাংলাদেশ কিছুটা এগিয়ে। উচ্চবিত্তরা বিলাসবহুল তো বটেই, আমাদের দেশে নিম্নবিত্ত খেটেখাওয়া মানুষের নৈমিত্তিক খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদে অন্তত যতটা চাকচিক্য ও স্বাচ্ছন্দ্য দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা— ওই অঞ্চলজুড়ে তেমনটি চোখে পড়ে না। তবুও মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রশ্নে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা এসব রাজ্যেও কোনো আতঙ্ক, সংশয় কাজ করে না। এটা সেখানকার রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর পরিপক্বতারই ফসল। দুর্নীতি শুধু এসব রাজ্যেই নয়, সমগ্র ভারতবর্ষেই নির্মূল হয়নি। তবুও সেটি আমাদের মতো এতটা সর্বগ্রাসী নয়। বাংলাদেশে সেলাক খুঁজে বের করতে হলে ‘কমিশন’ গঠন করতে হবে। অথচ পার্শ্ববর্তী ভারতবর্ষে রাজনীতিতে তো বটেই, সমাজের কোনো স্তরেই পরিপূর্ণ সততা-বিবর্জিত নয়। দুর্নীতি থাকলেও সেলাকের সমাহার সেখানে সততার একটা ভারসাম্য রেখেছে। এই পশ্চিমবঙ্গেই প্রায় ২৮ বছর মন্ত্রী থাকার পর সরকারের পতন হলে মন্ত্রিসভার প্রবীণতম সদস্যকে ক্যাম্বিসের জুতা, খাটো ধুতি ও ফতোয়া পরা অবস্থায় বাসের জন্য অপেক্ষা করতে দেখেছি। সেটা যেন রবীন্দ্রনাথের ‘কিনু গোয়ালা’ ও ‘হরিপদ কেরানি’র প্রতিচ্ছবি। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার সততার যে বিরল দৃষ্টান্ত, সেটার অনুসরণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তেমন কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না।

অসততা ও দুর্নীতির এই মহামারী, মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে জাতি কবে নিস্তার পাবে, সেটি এখন গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ, জাতির প্রতিটি সংকট মুহূর্তে এ দেশের মানুষ সব আন্দোলন গড়ে তুলতে তো কম ত্যাগ স্বীকার করেনি। হৃদয়ের গভীরে তীব্র যন্ত্রণায় একটি কথাই বারবার মনে হয়—কোন অভিশাপে এ জাতি বারবার বিজয়ী হয়েও হেরে যায়? বিজয়ের ফসল তাদের নসিবে জোটে না! কোটি কোটি মানুষ নির্বাচনের আন্দোলন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সংগ্রামে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। স্বৈরতন্ত্রের বক্ষবিদীর্ণ করে সফলতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনে। কিন্তু বাংলার দিগন্তবিস্তৃত আকাশে সেই সূর্য দীর্ঘদিন আলো ছড়াতে পারে না। ষড়যন্ত্রের কালো মেঘ আবার তাকে গ্রাস করে। জনতা যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যায়। বাংলাদেশের জাগ্রত লড়াকু জনতা ৪৭ বছর পরও একটা নিষ্কলুষ গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে—এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কী হতে পারে? সক্রিয় রাজনীতি থেকে আমার অবস্থান আজ অনেকটা দূরে। তবুও আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা অনেকের মতো আমার হৃদয়কেও দীপ্তিহীন আগুনের নির্দয় দহনে দগ্ধীভূত করে। মনে হয়, হঠাৎ একটি দমকা হাওয়া সব প্রত্যাশাকে না উড়িয়ে নিয়ে যায়! এ দেশে ৬৩টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে। দুটি বড় জোট আছে। তবু রাজনীতি থেকে আজ্ঞাবহতার সংস্কৃতি শেষ হচ্ছে না। গণতন্ত্রের বিকাশে এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিনির্মাণে দুর্নীতি ও আজ্ঞাবহতার মানসিকতা প্রধান অন্তরায়। কী প্রশাসন, কী বিচারিক ব্যবস্থা, কী রাজনৈতিক সংগঠন— সর্বত্রই আজ মোসাহেবী ও চাটুকারিতার জয়জয়কার। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে তো বটেই; যে দল যখন ক্ষমতায় আসে, খালি চোখে তাকালে মনে হয় গোটা দেশটিই যেন তাদের করায়ত্তে। আজকে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অত্যধিক আওয়ামী লীগ প্রেমী হয়ে গেছেন। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে তো বটেই, জেলায় জেলায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশের এসপি দস্তুরমতো পাজামা-পাঞ্জাবি পরে মুজিব কোট গায়ে দিয়ে আওয়ামী নেতার মতো বক্তৃতা করছেন। থানা পর্যায়ে ওসি সাহেবকে বাদ দিয়ে সভার বক্তার তালিকাই তো তৈরিই হয় না। কী ভয়ঙ্কর উৎসাহ দেখা যায় বিশেষ করে তাদের মধ্যে, যারা দু-এক বছরের মধ্যে অবসরে যাবেন। ক্ষমতার সায়াহ্নে নিজের সমস্ত প্রভাবটুকু ব্যবহার করে বক্তৃতার মঞ্চ থেকে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি তার ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথটি বিনির্মাণেই যেন আজ ব্যস্ত। ক্ষেত্রবিশেষে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়েও প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে একটি অংশ অধিকতর সক্রিয়।

এটা আজ সর্বজনবিদিত যে, একটা নীরব সন্ত্রাস জনজীবনকে তছনছ করে দিচ্ছে এবং এর খলনায়ক তারা, যাদের দায়িত্ব সন্ত্রাসকে প্রতিরোধ করা। একটা নির্ধারিত বয়সের ছেলেদের জীবনের নিরাপত্তা আজ প্রায় শূন্যের কোঠায়। তাদের অভিভাবকদেরও আজ বিপর্যস্ত অবস্থা। আগে কখনো কখনো মানুষ হাইজ্যাক করে মুক্তিপণ আদায় করত সমাজবিরোধীরা। আজ সেটা এতটাই প্রকাশ্য যে, বাড়ি থেকে তরুণ ও যুবকদের প্রকাশ্যে উঠিয়ে এনে অভিভাবকদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। নইলে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কমপক্ষে জামায়াত-শিবিরের তকমা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। পদ্মা সেতুর খুঁটি যতই দৃশ্যমান হোক না কেন, আগামী নির্বাচনে এ বিষয়গুলো কঠিন প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে বলে সরকার প্রধানের হৃদয়েও একটি আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই আশঙ্কার দোলাচলে তিনি কতটুকু প্রভাবান্বিত হবেন, তার ওপর নির্ভর করে আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তাটি।

আরেকটি বিষয়, নির্বাচনের আগে বিএনপি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাচ্ছে। এই বসার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ তার অনাগ্রহ ও অনিচ্ছার কথা খুব দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ করেছে। কিন্তু দেশের সচেতন মহল এটিকে পছন্দ করছেন না। যদিও আলোচনায় বসতে না চাওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অনেক মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে, তবুও জাতির বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করে আলোচনায় বসলে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে এলেও আসতে পারে। বিএনপির এমন কোনো জাদুকরী শক্তি নেই যে, আওয়ামী লীগকে আলোচনায় বসে কুপোকাত করে ফেলবে।
আমি বিনম্র চিত্তে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করেছেন। তাতে আন্দোলনের গতি নিষ্প্রভ হয়নি। বরং আলোচনার ব্যর্থতার দায়ভার পাকিস্তানকেই নিতে হয়েছিল। অথচ আজকাল আলোচনার কথা উঠলে কোনো একটি পক্ষ অনড় ও নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে ফেলে। রাজনীতিতে এই সংস্কৃতিও দূর হওয়া দরকার।
যাই হোক, সব অনিশ্চয়তা ও সংশয় কাটিয়ে প্রশাসনের সার্বিক দায়িত্ব কার্যকরভাবে নির্বাচন কমিশনের হাতে অর্পণ করে একটা সর্বজনীন অংশীদারিত্বের নির্বাচন করা সম্ভব। তবে সংসদকে ৯০ দিন আগে অবশ্যই ভেঙে দিতে হবে। সংসদ সদস্যদের পদ শূন্য না হলে আরেকটি সংসদ নির্বাচিত হয় কীভাবে? এটা জেদের বিষয় নয়। সংসদ ভেঙে দিলে আওয়ামী লীগের জন্য এটা রাজনৈতিক পরাজয় হবে না। বরং সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ প্রভাব বিস্তারে সাহায্য করবে এবং বিএনপিসহ সবাইকে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করবে। আশা করি, আওয়ামী লীগ বিষয়টি বুঝতে ভুল করবে না।

লেখক: নূরে আলম সিদ্দিকী। ১৯ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত।

By | 2018-02-07T07:28:03+00:00 January 23rd, 2018|News|0 Comments

Leave A Comment

X